আপনার মন্তব্য পাঠাতে ফর্মটি ব্যবহার করুন৷
আপনার বার্তা
বিষয়
আপনার বার্তা
আপনার নাম
নামের শেষাংশ
লিঙ্গ



ইমেল ঠিকানা
শহর
দেশ
পাসপোর্টের লাইনে ‘ভিআইপি জাদু

ফ্রান্স দূতাবাসের সামনে ‘অ্যাপয়েন্টমেন্টের হাট

User Image
  ওয়েব নিউজ
প্রকাশিত - ১২ আগস্ট, ২০২৬   ০৩:১২ পিএম
webnews24
ছবি: || ওয়েব নিউজ
বদরুল বিন আফরোজ , ফ্রান্স

পাসপোর্ট নবায়ন, হারিয়ে যাওয়া পাসপোর্টের আবেদন কিংবা নতুন পাসপোর্টের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যেন ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের কাছে এখন এক ধরনের ‘লটারি’। ভাগ্য ভালো হলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিলবে, আর ভাগ্য আরও ভালো হলে হয়তো পরিচিত কারও ফোনে দূতাবাসের দরজাও খুলে যেতে পারে!

বুধবারের তথাকথিত ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া সেবা’কে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে আজ দেখা গেল এক অভিনব দৃশ্য। প্যারিসের রাস্তায় কয়েকশো বাংলাদেশি প্রবাসী সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে। কেউ এসেছেন দূর শহর থেকে, কেউ ভোরে রওনা দিয়েছেন, কারও আবার কাজের ছুটি কেটে এসেছে শুধু একটি পাসপোর্টের আশায়।

দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে, এটি কোনো দূতাবাস নয়, বরং শহরের মাঝখানে বসেছে বহু প্রতীক্ষিত ‘পাসপোর্টের হাট’।

কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে, কেউ রাস্তার পাশে অপেক্ষমাণ, কেউ আবার বুঝতে চেষ্টা করছেন কোন লাইনটি আসলে কোন লাইনের জন্য। এর মধ্যেই হাতে মাইক নিয়ে একজনকে দেখা যায় লাইন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে।

প্রবাসীদের কেউ কেউ সেই দৃশ্যের সঙ্গে রসিকতা করে বলছেন,কোরবানির হাটেও গরুর লাইন এতটা জটিল হয় না! আরেকজনের ভাষায়,মনে হচ্ছে মাইকে বলা হচ্ছে, এই পাশের গরু ভালো, ওই পাশের গরুর সাইজ ছোট, আর যাদের বিশেষ পরিচয় আছে তারা সরাসরি ভিআইপি গেটে যান!

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই, কিন্তু ‘ব্যবস্থা’ আছে? প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, দূতাবাসের পাসপোর্ট সংক্রান্ত সেবায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। অনেকে দিনের পর দিন চেষ্টা করেও অনলাইনে কাঙ্ক্ষিত সময় পাচ্ছেন না। এর ফলে অনেকের বৈধ কাগজপত্র ও বসবাসের অনুমতিসংক্রান্ত বিষয়েও জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরই মধ্যে দূতাবাসের পক্ষ থেকে বুধবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই নির্দিষ্ট সেবা দেওয়ার কথা জানানো হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই সেবা নিতে এসে অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা দূতাবাসের বাইরে অপেক্ষা করছেন বলে অভিযোগ।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই: অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া সেবা যদি সত্যিই থাকে, তাহলে সেই সেবা পেতে কয়েকশো মানুষকে কেন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ‘অ্যাপয়েন্টমেন্টের মতো’ অপেক্ষা করতে হবে?

পরিচয় থাকলে কি লাইনের দৈর্ঘ্য ছোট হয়ে যায়? প্রবাসীদের মধ্যে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজনের দাবি, তারা রাজনৈতিক নেতা বা পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে দূতাবাসে অপেক্ষাকৃত সহজে প্রবেশ ও সেবা পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

একজন প্রবাসীর দাবি, তিনি একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগের পর অর্থ প্রদান করেন এবং তাকে বলা হয় দূতাবাসের সামনে এসে ফোন করতে। পরে তিনি ফোন করলে দূতাবাসের ভেতরে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং কিছুক্ষণ পর তাকে ডেকে নিয়ে কাজটি করে দেওয়া হয়।

অভিযোগটি সত্য হলে প্রশ্ন উঠতেই পারে: তাহলে কি দূতাবাসে সেবা পাওয়ার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্টের চেয়ে ‘পরিচয়পত্র’ বেশি কার্যকর?

তবে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ প্রবাসীদের প্রশ্নটি বেশ সরল: আমরা যদি সবাই বাংলাদেশি নাগরিক হই, তাহলে কারও জন্য দরজা খোলে পরিচয়ে, আর কারও জন্য কেন রাস্তার ফুটপাত?

সাংবাদিকতা, ফেসবুক আর ‘পজিটিভ নিউজের’ গল্প পাসপোর্ট সেবা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সম্প্রতি কয়েকজন সাংবাদিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী সমালোচনা শুরু করলে বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকেও আলোচনা-সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে দূতাবাসের পক্ষে কিছু সাংবাদিকের মাধ্যমে ইতিবাচক প্রতিবেদন ও বক্তব্য প্রচারের অভিযোগও উঠেছে। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। একদিকে প্রবাসীদের ক্ষোভ, অন্যদিকে দূতাবাসের সাফাই। মাঝখানে দাঁড়িয়ে সাধারণ প্রবাসী যেন সেই পুরোনো প্রবাদটির বাস্তব সংস্করণ:  দুই পক্ষের কথার যুদ্ধ, আর মাঝখানে পাসপোর্টের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ।

আজকের ছবিটাই কি হাজার কথার উত্তর? আজ দূতাবাসের সামনে ধারণ করা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘ সারিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী অপেক্ষা করছেন। কারও হাতে কাগজপত্র, কারও কাঁধে ব্যাগ, কেউ আবার সন্তান বা পরিবারের সদস্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

তাদের অনেকেই এসেছেন ফ্রান্সের বিভিন্ন শহর থেকে। কারও জন্য কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা মানে কয়েক ঘণ্টার কাজের ক্ষতি। কারও জন্য এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বসবাসের কাগজপত্রের সময়সীমা। আবার কারও পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে আরও বড় অনিশ্চয়তা।

অথচ সমাধানটা হওয়ার কথা ছিল খুবই সাধারণ: অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট, নির্ধারিত সময়ে উপস্থিতি, সেবা গ্রহণ এবং বাড়ি ফেরা। বাস্তবে সেটি যেন পরিণত হয়েছে: ভোরে রওনা  দূতাবাসের সামনে লাইন কোন লাইনে দাঁড়াবেন তা নিয়ে বিভ্রান্তি মাইকে নির্দেশনা  ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা  শেষ পর্যন্ত ভাগ্য ও পরিচয়ের পরীক্ষা।

দূতাবাস কি জবাব দেবে? বিষয়টি নিয়ে দূতাবাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদকের কাছে জানা গেছে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে: অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা যদি কার্যকর হয়, তাহলে শত শত মানুষ কেন রাস্তায়? অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া সেবা যদি থাকে, তাহলে সাধারণ প্রবাসীরা কেন সমানভাবে সেই সেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন?

আর সত্যিই যদি কোনো অনিয়ম না থাকে, তাহলে পরিচয় বা বিশেষ সুপারিশের মাধ্যমে দ্রুত সেবা পাওয়ার অভিযোগগুলো তদন্ত করে পরিষ্কার করা হবে কি?

ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা চান না কোনো বিশেষ সুবিধা। তাদের দাবি খুব বেশি কিছু নয়। তারা শুধু চান, পাসপোর্টের জন্য পাসপোর্টই যথেষ্ট হোক, পরিচয় নয়। কারণ দূতাবাস যদি সবার হয়, তাহলে তার দরজার সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলোর মর্যাদাও সবার সমান হওয়া উচিত। 

নইলে আগামী বুধবারও হয়তো একই দৃশ্য দেখা যাবে। শুধু পার্থক্য হবে, লাইনের মানুষগুলো নতুন হবে, কিন্তু ‘পাসপোর্টের হাট’ আগের মতোই জমজমাট থাকবে।


 

প্যারিস বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসী
ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন
পাসপোর্টের লাইনে ‘ভিআইপি জাদু
Aubervilliers প্রশাসনিক সহায়তা কেন্দ্র
গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার