ওয়েব নিউজ |
ফ্রান্সের শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষক সংকট নিরসন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে প্যারিসের আশপাশের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুরু হওয়া এ আন্দোলন সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দেশটির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে কয়েকটি স্থানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো আগামী ৬ অক্টোবর দেশজুড়ে বড় সমাবেশের ডাক দিয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের ৩৫৬টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিক্ষোভ ও অবরোধের কারণে প্রভাবিত হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন ৬২৫ জনকে আটক করা হয়। সংঘর্ষে ৮৩ জন পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য আহত হন। অন্যদিকে, শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানিয়েছেন, আন্দোলন শুরুর পর থেকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মী মিলিয়ে ১১৯ জন আহত হয়েছেন। এসব সংখ্যা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে।

বিক্ষোভের সূত্রপাত প্যারিসের আশপাশের শহরতলির বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ থেকে। তাদের অভিযোগ, শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রীর অভাব এবং পুরোনো ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর কারণে পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানোর দাবিও জানিয়েছেন তারা।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় শহরতলির অনেক স্কুলে সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। তারা মনে করেন, পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থানের ভিত্তিতে নয়, বরং সবার জন্য সমান মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্যারিসের উত্তরে অবস্থিত সেন্ট ডেনিস শহরের লিসে পল-এলুয়ারসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন। সেখানকার শিক্ষার্থীরা শিক্ষক সংকট, স্কুলের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি এবং পড়াশোনার পরিবেশ উন্নয়নের দাবি তুলেছেন। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কিছু শিক্ষকও শিক্ষা খাতের সমস্যাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। ওই দিন শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির পাশাপাশি সরকারি খাতের কর্মীদের ধর্মঘট ও বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের সময় আগুন জ্বালানো, সম্পত্তি ভাঙচুর এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। লিলসহ কয়েকটি শহরে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে। ১ অক্টোবরও ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় স্কুল অবরোধ ও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে কর্মসূচি পালিত হয়।
এদিকে, ফ্রান্সের ২০২৭ সালের বাজেট নিয়ে সরকারের ব্যয়সংকোচন পরিকল্পনাও আন্দোলনের পটভূমিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, সরকারি ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও চাপ তৈরি করতে পারে। তবে সরকারের বাজেট পরিকল্পনা ও শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের অভিযোগও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বিক্ষোভের মধ্যে সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা পুলিশের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের নিন্দা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, শিক্ষক সংকটের সমাধান এবং সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।
ইউনিয়ন এত্যুদিয়ঁ ও ইউনিয়ন সাঁদিকাল লিসেয়েন নামের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো ১ অক্টোবর স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে আগামী ৬ অক্টোবর বড় পরিসরে শিক্ষার্থী ও তরুণদের সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে তারা। সংগঠনগুলোর লক্ষ্য, শিক্ষা খাতের সংকট ও সামাজিক বৈষম্যের বিষয়টি সরকারের কাছে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা।
আগামী ৬ অক্টোবরের কর্মসূচিতে কতসংখ্যক শিক্ষার্থী ও তরুণ অংশ নেন এবং আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয় কি না, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেও নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের।
