ওয়েব নিউজ |
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি, শিক্ষা ও সরকারি সেবার সংকট ঘিরে চলমান আন্দোলন নতুন করে জোরালো হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে বড় ধরনের ধর্মঘট ও বিক্ষোভের পর আগামীকাল শনিবার আবারও রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক ও বিভিন্ন আন্দোলনকারী সংগঠনের সদস্যরা।
রাজধানী প্যারিসে শনিবার বেলা দুইটায় দুটি পৃথক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিক ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর যৌথ মিছিলের অনুমতি দিয়েছে পুলিশ। মিছিলটি প্লাস দ্য লা রিপুবলিক থেকে শুরু হয়ে প্লাস দ্য লা নাসিওঁ পর্যন্ত যাওয়ার কথা। অন্যদিকে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা একই সময়ে প্লাস দ্য লা কনকর্দে এলাকায় সমাবেশের ডাক দিয়েছেন। তবে শুক্রবার পর্যন্ত ওই সমাবেশের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিশ্চিত হয়নি।
আন্দোলনকারীদের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, শুধু প্যারিস নয়, ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরেও বিক্ষোভ ও সমাবেশের আহ্বান জানানো হয়েছে। ফলে শনিবার দেশটির বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ও জনজীবনে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে শ্রমিক ধর্মঘট ও বিক্ষোভে ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। বেতন বৃদ্ধি, ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, সরকারি সেবায় বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ওই দিনের বিক্ষোভে সারা দেশে ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ অংশ নেন। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসে ছিলেন ৬৫ হাজার। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠন সিজিটি দাবি করেছে, দেশজুড়ে তাদের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন ১৫ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ। সংগঠনটির হিসাবে প্যারিসে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল সাড়ে তিন লাখ।
অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি হিসাব ও শ্রমিক সংগঠনের হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। তবে উভয় হিসাবেই বৃহস্পতিবারের আন্দোলনকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় বিক্ষোভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চলমান আন্দোলনে উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত সংকট, শিক্ষার সুযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে অসন্তোষ থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি শিক্ষক সংগঠন এসএনইএস-এফএসইউ আগামী শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, বেতন ও পেনশন বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবা রক্ষার দাবি তুলেছে।
বৃহস্পতিবারের আন্দোলনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রভাব পড়ে। ফরাসি সরকারের হিসাবে দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছে। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি, আন্দোলনের প্রভাব আরও বিস্তৃত ছিল।
বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভের বেশির ভাগ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ওই দিন ৪৪৮ জনকে আটক করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে প্রায় ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল।
প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, লিওঁ, রেন, বোর্দো ও নঁত শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। কয়েকটি স্থানে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
চলমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু আগামী ৯ নভেম্বর শ্রমিক সংগঠন ও নিয়োগকর্তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি সামাজিক সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। বেতন বৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা-সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে।
তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, শুধু আলোচনার আশ্বাস যথেষ্ট নয়। বেতন, পেনশন, সরকারি সেবা ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
শুক্রবার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে ফ্রান্সের প্রধান শ্রমিক ও শিক্ষক সংগঠনগুলো সরকারের কাছে আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে কার্যকর জবাব চেয়েছে। তারা আন্দোলন দমনে বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
শনিবারের কর্মসূচি ফ্রান্সের চলমান আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে প্যারিসে শ্রমিক-শিক্ষকদের অনুমোদিত মিছিল এবং ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীদের পৃথক সমাবেশকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির দিকে নজর থাকবে সবার। তবে বৃহস্পতিবারের মতো বড় জনসমাগম শনিবারও হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
