ওয়েব নিউজ |
ফ্রান্সে বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম পুরাতন ও পরিচিত একটি মসজিদ সম্প্রতি প্রশাসনের সিদ্ধান্তে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কমিউনিটির মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মুসল্লিরা এই মসজিদে নামাজ আদায় করে আসলেও হঠাৎ করেই মাদ্রাসার নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালুর পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মসজিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে সিটি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করে। তদন্তের এক পর্যায়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ সামনে আসে। এরপর ধাপে ধাপে নজরদারি বাড়ানো হলে শেষ পর্যন্ত মসজিদটি বন্ধ করে দেয় প্রশাসন।
অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসার নামে পরিচালিত ওই কার্যক্রম মূলত একটি ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। পরে সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট ইমাম আবারও নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা শুরু করেছেন বলে কমিউনিটির অনেকেই দাবি করছেন। তবে নতুন উদ্যোগটি সত্যিই ধর্মীয় ও সামাজিক কল্যাণে কাজ করবে, নাকি আগের মতোই ব্যক্তিগত স্বার্থে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।
কমিউনিটির একাধিক সদস্য অভিযোগ করে বলেন, এর আগেও বিভিন্ন জন ফ্রান্সে “মসজিদ” ও “মাদ্রাসা” প্রতিষ্ঠার নামে অনেকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মসজিদ নির্মাণ না করে সেই অর্থ দিয়ে ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। এমনকি যারা অনুদান দিয়েছিলেন, মসজিদ না হওয়ার পরও তারা অর্থ ফেরত পাননি বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে অনুদানদাতারা প্রশ্ন তুললে সংশ্লিষ্টরা নাকি বলে আসছেন, “মসজিদের টাকা সংরক্ষিত আছে, পরে ফেরত দেওয়া হবে।” তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
কমিটির কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মসজিদ কিংবা মাদ্রাসার জন্য অর্থ সংগ্রহের সময় সাধারণ মানুষকে বলা হয় প্রতিষ্ঠানটি কোনো ব্যক্তির নামে নয়, বরং সোসাইটির নামে পরিচালিত হবে। উদ্দেশ্য থাকে যেন ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠাতারা মারা গেলেও অন্যরা এর দায়িত্ব নিয়ে ধর্মীয় কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেন।
আরও পড়ুন: ফ্রান্সের এক মসজিদের চিরস্থায়ী সরকার" কেয়ামত পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মসজিদ বা মাদ্রাসার জন্য জমি কিংবা প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের সময় তা ব্যক্তিগতভাবে দুই-তিনজনের নামে, এমনকি কখনো একজনের নামেও রেজিস্ট্রি করা হয়। তাদের আশঙ্কা, এক প্রজন্ম পর এসব সম্পদের মালিকানা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সন্তান বা আত্মীয়-স্বজনের হাতে চলে যেতে পারে। তখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর অস্তিত্ব হারিয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তারা আরও বলেন, অতীতেও এ ধরনের বহু প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা ব্যক্তি মালিকানায় চলে গেছে।
ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির বেশ কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ধর্মকে পুঁজি করে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করছে। তাদের দাবি, বাংলাদেশে থেকেও অনেকে একই ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ফ্রান্সে এসেও সেই প্রবণতা অব্যাহত রেখেছেন।
তাদের মতে, এসব অনিয়মের কারণে শুধু আর্থিক প্রতারণাই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্মের ধর্মীয় শিক্ষাও। অনেক শিশু প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা, কোরআন তেলাওয়াত ও নামাজ শিক্ষার সঠিক দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কমিউনিটির সচেতন মহল।
ফ্রান্সের বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকেই এখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঠিক তদারকির দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে ধর্মের নামে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত ব্যবসা বা প্রতারণার সুযোগ না থাকে।
